একটি পূর্বঘোষিত হত্যাকাণ্ডের বৃত্তান্ত
চন্দন দে
একটা খুনের সাজা বেয়াল্লিশ মিনিটের জেল।
একটু খটকা লাগছে কি? লাগলেও কিচ্ছু করার নেই, একেবারে নির্ভুল উত্তর— দশে দশ।
কে সি নাগের বইয়ে ঐকিক নিয়মের চ্যাপ্টারটা খুলে একটা অঙ্ক কষে দেখে নিতে পারেন। প্রশ্নটা ছিল, পঁচিশ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য ৭অভিযুক্তের শাস্তি হয়েছে দু’বছর সশ্রম কারাদণ্ড। তাহলে একটা মৃত্যু পিছু কারাবাস কত? হিসেবটা আর দুর্বোধ্য ঠেকছে না তো! হ্যাঁ, এটাই নির্মম ন্যায় বিচার!
ও! একটা মারাত্মক ভুল হয়ে গেলো। পঁচিশ হাজার মৃত্যুর হিসেবটা তো আই সি এম আর (ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ) এবং ঐ গ্যাস পীড়িত সংগঠনগুলির ‘সংখ্যা ভাঁড়ানো’ হিসেব। তাই সরকারী বইয়ের হিসেব মতো অঙ্কটা আরেকবার কষে ফেলুন। মৃত্যু: পনেরো হাজার। অতএব, সাজা: সত্তর মিনিট।
এতদিন ভোপালের মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব সামলানো মোহন পি তিওয়ারি সামান্য ঐকিক নিয়মের অঙ্ক ভুলে গেছেন, তা নিশ্চয়ই নয়। হাই-প্রোফাইল কর্পোরেট বিচার শেষ করে পদোন্নতির আদেশ মাথায় নিয়ে পরদিনই ভোপালের অতিরিক্ত জেলা বিচারপতির পদে যোগ দেওয়া বিচারপতি তিওয়ারি জোর গলাতেই জাহির করছেন, ‘নিশ্চিতভাবেই ন্যায় বিচার হয়েছে।’
ঠিকই তো ন্যায় বিচার তো হয়েছেই। ‘আইন দেবী’র চোখে তো কাপড় বাঁধা, তিনি তো আর পক্ষপাত করতে পারেন না। তিনি তো চলেন তথ্য প্রমাণ, ধারা-উপধারাকে ভিত্তি করে। ঠিকই তো, মামলা চলছিল ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ক ধারায়। সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ক্ষেত্রে গাড়িচালকের বিরুদ্ধে ঐ ধারায় মামলা করা হয়। সর্বোচ্চ শাস্তি দু’বছরের জেল আর জরিমানা। তার সঙ্গে যে ৩৩৬, ৩৩৭ ও ৩৩৮ নম্বর ধারা ছিল, তার কোনোটাতেই দু’বছরের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকার বেশি জরিমানার সুযোগ আইনে নেই।
রায় বেরোনোর রাতে টেলিফোনে কথা হলো সাধনা কারণিকের সঙ্গে। গত ছাব্বিশ বছর ধরে সাধনা গ্যাস পীড়িতদের লড়াইয়ে আছে। সুখের ঘরদোর আর মাস মাইনের চাকরি ছেড়ে ঘটনার একদিন পরই ইন্দোরের মেয়ে সাধনা এসে আস্তানা গেঁড়েছিল বিধ্বস্ত ভোপালে। তারপরের ছাব্বিশটা বছর কেটে গেছে আইনী লড়াই, বেঁচে থাকার লড়াই, বাঁচিয়ে রাখার লড়াই লড়তে লড়তে।
ভেঙে পড়া মন নিয়ে সাধনা ধারাবিবরণী দিচ্ছিল সেদিনের কোর্ট চত্বরের। বিচারপতি তিওয়ারির নির্দেশে আদালত কক্ষে ওঁরা সেদিন ব্রাত্য। ঢুকতে পারবে কেবল অভিযুক্ত ও তার আইনজীবীরা। বাকিদের প্রবেশ নিষেধ। সে তুমি সুপ্রিম কোর্টে এই কাণ্ডের পিটিশনারই হও আর ক্ষতিগ্রস্তই হও—তোমার জন্য আদালতের দরজা বন্ধ। সাংবাদিকদেরও ঢুকতে দেওয়া হয়নি, এমনকি মামলার সাক্ষীদেরও। সাধনার কথায়, যে মহিলা পুলিস খানিক আগেই আমাদের লাঠির গুঁতো দিয়েছে, সেই দেখলাম অন্যতম অভিযুক্ত কিশোর কামদারকে ‘আইয়ে আইয়ে কামদার সাহাব’ বলে সম্ভ্রমের সাথে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। ওঁর আগেই অবশ্য ওঁর প্রাক্তন বস কেশব মহিন্দ্রা যখন আদালতে জনতা তাকে স্বাগত জানালো ‘কাসভ’ মহিন্দ্রা বলে। আদবানিরা শুনলে হয়তো দুঃখ পাবেন, যে শিল্পপতিকে ২০০২সালে তাঁরা পদ্মভূষণ দিতে চেয়েছিলেন, ২০১০-এ মানুষ তার নামের সাথে জুড়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক এক সন্ত্রাসবাদীর নাম।
তবু কেশব মহিন্দ্রার এক সঙ্গী যখন সেদিন আদালত কক্ষ থেকে বেরিয়ে প্রথম খবরটা জানালো, ৩০৪ক ধারায় সব অভিযুক্তই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, তখন আদালতের বাইরের ভিড়টা যেন একটু নড়েচড়ে বসেছিল। ভেতরে হয়তো তখন চলছিল আইনী কূটকাচালি, দু বছর জেল? না কি এক বছর, না ছ’মাস? অথবা শুধু জরিমানা?
বাইরে রশিদা বাঈ, হামিদা বাঈ বা কমলা বাঈদের মতো কেউ কেউ হয়তো তখনও ভাবছিল, বহুদিন ধরে মনের কোণে পুষে রাখা ইচ্ছেটা এবার পূরণ হবে। কড়া শাস্তি হবে ওদের। স্বপ্ন কিছুতেই বাস্তব হয়নি। আইনী ধারা মেনে দোষীদের সর্বোচ্চ সাজাই ঘোষণা করেছেন বিচারপতি মোহন তিওয়ারি। আর আইনবলে সড়ক দুর্ঘটনার সমান ক্রাইম করায় ‘অপরাধী’ ২৫হাজার টাকার ব্যাক্তিগত জামিনে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন। ফিরবেন এটা জেনেই অবশ্য রিটার্ন টিকিট পকেটে পুরেই তারা আদালতে গিয়েছিলেন।
এসেছিলেন পুলিসী নিরাপত্তায়, পুলিসী ব্যাটনের ঘুর্ণিঝড়েই তাঁরা ফিরে গেলেন। মাঝের চারটে ঘন্টা শুধু মঞ্চস্থ হলো ‘ন্যায় বিচার’ নামাঙ্কিত চড়া দাগের এক নাটক, যার জন্য ভোপালের মানুষ, ভোপালের বাইরের মানুষ অপেক্ষা করে ছিল তেইশটা বছর।
ঠিক এভাবেই ২৬বছর আগে ভোপালে মাত্র ছ’ঘন্টা নাটুকে পুলিসী হেফাজতে কাটিয়ে মার্কিন মুলুকে পালিয়ে গিয়েছিলেন ইউনিয়ন কার্বাইডের তৎকালীন সি ই ও, এই গণহত্যার মূল অভিযুক্ত ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসন। এই সোমবার আদালত চত্বরে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ যে স্লোগানটা শোনা গেছে, তা ছিল, ‘অ্যাণ্ডারসনকো ফাঁসি দো।’ সেদিনও রাজ্য সরকারের বিমানে দিল্লি পাঠানোর সময় ঐ অ্যাণ্ডারসনকে সেলাম ঠুকেছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিস অফিসার। বিমানে ওঠার সময় হাতের গার্মেন্ট বক্স (বিজনেস স্যুট ক্যারি করার জন্য) আর ব্রিফকেসটা যাতে তাকেই বইতে না হয়, তার জন্য পুলিস অফিসারের কত অনুনয়-বিনয়।
অথচ তখনকার মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিং সকাল আটটায় ভোপালের জেলাশাসককে নিজের বাড়িতে ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন, আপনি এখনই বিমানবন্দরে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাণ্ডারসন এসে পড়বে। এয়ারপোর্ট আধিকারিকদের বলা আছে, যতক্ষণ না আপনি পৌঁছাচ্ছেন, বিমান যেন নামতে দেওয়া না হয়।
সেই জেলাশাসক মোতি সিং যখন বিমানবন্দরে পৌঁছালেন, দেখলেন, বিমান নেমে গেছে। তবে দরজা খোলেনি। সেখানেই অ্যাণ্ডারসনের সঙ্গে কেশব মহেন্দ্র ও বিজয় গোখলেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় শামলা হিলসে ইউনিয়ন কার্বাইডের বিলাসবহুল গেস্টহাউসে।
কিন্তু দুপুর দুটোয় মুখ্য সচিব ব্রহ্ম স্বরূপ জেলাশাসক মোতি সিং আর পুলিস সুপার পুরীকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠান। তাঁদের বলা হয়, অ্যাণ্ডারসনের জন্য একটা বিমান অপেক্ষা করছে। যত শীঘ্র সম্ভব নিয়ম-কানুন শেষ করে ও যাতে দিল্লি উড়ে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করা হয়।
গত বুধবার এই গোটা উপাখ্যান ফাঁস করে মোতি সিং জানিয়েছেন, তিনিই নিয়ম-কানুন মেনে অ্যাণ্ডারসনের জামিনের ব্যবস্থা করেন। সেবারও ব্যাক্তিগত জামানত ছিল ঐ পঁচিশ হাজার টাকাই। মোতি সিং এখনও ধোঁয়াশায়, সকালে যে সরকারকে মনে হয়েছিল ইউনিয়ন কার্বাইডের প্রতি বেশ কঠোর মনোভাব নিচ্ছে, বেলা গড়াতেই কার অঙ্গুলি হেলনে এমন ভোলবদল। আমলা মহলে একটা কথা ঘোরাঘুরি করে, স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগন নাকি অ্যাণ্ডারসনের জন্য ভারতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তির সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
তখনও এ বিশ্বটা এমন মার্কিন দিকে ঝুঁকে পড়েনি। তারই মধ্যে এদেশে যে মার্কিন লেজুড়বৃত্তি শুরু হয়ে গিয়েছিল অ্যাণ্ডারসন পর্ব তারই নজির। ‘ন্যায় বিচার’-এর নির্মম উদাহরণে সোমবারের রায়— দোষী সাব্যস্ত, সাজাপ্রাপ্ত কোনো জায়গাতেই নাম পর্যন্ত উল্লেখ হয়নি অ্যাণ্ডারসনের।
শুধু দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করাই নয়, যাতে তাঁকে আর কোনো ভাবে এদেশের আদালতে হাজিরা দিতে না হয়, তার ব্যবস্থাও পাকা করা হয়েছে। ভারতীয় বিচারব্যবস্থা, তদন্তকারী সংস্থা সি বি আই, কর্পোরেট লবি, রাজনীতি একযোগে একাজ করেছে। অ্যাণ্ডারসনকে কেবলমাত্র ফেরার ঘোষণা করেই দায় এড়িয়েছে বিচারব্যবস্থা। আর সি বি আই চেষ্টা করেছে যাতে মামলা লঘু করা যায়। সরকার সি বি আই-কে চাপ দিয়েছে যাতে অ্যাণ্ডারসনের প্রত্যার্পণ নিয়ে না এগোনো হয়।
ভারতের আদালত যখন তাঁকে ‘ফেরার’ ঘোষণা করছে ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসন তখন ঘন ঘন শাটল যাতায়াত করে বেড়াচ্ছেন নিউইয়র্কের লঙ আইল্যাণ্ড, ফ্লোরিডা আর গ্রীনউইচ, মার্কিন বড়লোকদের তিন লীলাক্ষেত্রের মধ্যে। আফগানিস্তানের কোন গুহায় লাদেন লুকিয়ে আছে, তা এক নিমেষেই জানিয়ে দিতে পারলেও এত গুলো বছরেও মার্কিন কর্পোরেট ক্রিমিনাল ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসনের হদিস দিতে পারে না সেই মুলুকের দুঁদে গোয়েন্দা সংস্থা, এফ বি আই।
আশ্চর্য ঠেকলেও এটাই সত্য।
যেমন সত্য, ১৭৮জন সাক্ষীকে হাজির করলেও সি বি আই কখনও সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য রাম চরণ বাথামকে ডাকেনি। কে এই বাথাম?
ভোপালের তৎকালীন জেলাশাসক মোতি সিং ১৯৮৪-র ৭ই ডিসেম্বরের কথা ফাঁস করলেও ২রা ডিসেম্বর নিয়ে এবার কিছু বলেননি। ঘটনা হলো, ঐদিন দুপুরে বাথাম জেলাশাসককে ফোন করেছিলেন। আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, কারখানা দিয়ে অল্প অল্প বিষাক্ত গ্যাস বেরোচ্ছে। কিন্তু অফিসিয়ালদের দল তা অস্বীকার করে। সেই অফিসিয়ালদের মধ্যে ছিল কে ভি শেট্টি, তখনকার প্ল্যাণ্ট সুপারিনটেন্ডেন্ট। গত ৭ই জুন এই শেট্টিরও সাজা ঘোষণা হয়েছে।
কোন অজ্ঞাত কারণে সি বি আই ঐ ইউনিয়ন কার্বাইডেরই মেকানিক রাম চরণ বাথামকে সাক্ষ্য দিতে ডাকলো না কে জানে?
গত কুড়ি বছরে কারণে-অকারণেই ভোপাল যেতে হয়েছে। কথা হয়েছে সাধনা কারণিক থেকে আব্দুল জব্বরের মতো গ্যাস পীড়িতদের সংগঠনের মাথাদের সাথে। কথা হয়েছে, হালিমান বি থেকে রশিদা বি, অর্চণা বাঈদের মতো গ্যাসের কাণ্ডে অন্ধ চোখ, বিষ গ্যাস ভরা ফুসফুস আর পঙ্গু সন্তান নিয়ে জীবনের হাপর টানতে থাকা গ্যাস পীড়িতদের সঙ্গেও। সকলেই বলেছেন, সি বি আই মামলাটাকে লঘু করে দিচ্ছে। সকলেই বলেছেন, চেষ্টা করলে রোখা যেত ঐ মারাত্মক বিভীষিকার রাত। সকলেরই অভিযোগ, যতই ওরা নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দেশের সেরা বলে দাবি করুন, কারখানার নকশা, প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যে ত্রুটি-গাফিলতি ছিল এবং তা থেকে যে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তা সংস্থার কর্তাদের আগে থেকেই জানা ছিল।
দুর্ঘটনা এই কারখানায় লেগেই থাকতো, কর্তৃপক্ষ অবশ্য সে সব খবর প্রভাব খাটিয়ে চেপে রাখতো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য চেপে রাখা যায়নি। ১৯৮১সালের ২৬শে ডিসেম্বর ফসজিন গ্যাস লিক হয়ে মৃত্যু হয় প্ল্যান্ট অপারেটর মহম্মদ আসরাফের। পরের বছর ৯ই জানুয়ারি আবার লিক করেছিল গ্যাস। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন ২৫জন শ্রমিক।
মৃত্যু পরোয়ানা এখানেই শেষ নয়। ১৯৮২-রই ৫ই অক্টোবর মধ্যরাত। মিক প্ল্যান্টে কাজ করছিলেন অপারেটর ওয়াদেকার। দুটো পাইপলাইনের সংযোগকারী ভালভ খুলতেই বিস্ফোরণ। মারণ তরল মিথাইল আইসোসায়ানাইট এমনভাবে বেরিয়ে এলো যেন জ্বলন্ত লাভা। মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে দিলো ‘অলক্ষুণে’ সাইরেনের শব্দ।
ইউনিয়ন কার্বাইড চত্বরের মধ্যেই এই ঘটনা ঘটলেও বাতাসে মিশে মিথাইল আইসোসায়ানাইট তার আসল রঙ চেনাতে শুরু করলো। ফলাফল হলো আশপাশের গ্রীন পার্ক কলোনি, নারাইল খেড়া, ছোলা রোডের মানুষজন গভীর ঘুমের মধ্যেই শ্বাসকষ্ট অনুভব করতে থাকলেন। সাইরেনের শব্দে ঘুম ভেঙে তাঁরা আতঙ্কের বিনিদ্র রাত জাগলেন।
যাঁরা আবার এই বিপদটার কথা জানতেন, বাঁচার তাগিদে তাঁরা ছুট লাগিয়েছিলেন নতুন শহরের দিকে। এই ঘটনায় গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন সংস্থার চার কর্মী। আতঙ্কের হুড়োহুড়িতেও আবার জখম হয়েছিলেন অনেকজন।
চুরাশির ডিসেম্বরের সেই রাতের মাস ছয়েক আগেই এই সমস্ত দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে স্থানীয় সাংবাদিক রাজকুমার কেশোয়ানি ইউনিয়ন কার্বাইডের ত্রুটিপূর্ণ প্রযুক্ত ও সংস্থার গাফিলতির ফলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে সজাগ করেছিলেন। ১৬ই জুন, ১৯৮৪তারিখে জনসত্তা পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আগ্নেয়গিরির মাথায় দাঁড়িয়ে ভোপাল’ শীর্ষক নিবন্ধে কেশোয়ানি এও জানিয়েছিলেন, তিরাশিতেও দু-দুটো দুর্ঘটনা হয়েছিল। এমনকি ১৯৮৪-র প্রথমদিকে কয়েকমাস রাসায়নিক অ্যালার্জিতে ভুগে মারা যান ইউটিলিটি সেকশনের অরুণ মাথুর। মৃত্যুর কারণ নিয়ে খোঁজখবর তো হয়ইনি, বরং মাথুরের পরিবারকে জোর করে রাজস্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাহলে গোটাটাই কি বহুজাতিক ইউনিয়ন কার্বাইডের গাফিলতি? সরকার-প্রশাসন বলতে তাহলে এদেশে কিছুই ছিল না? এপ্রসঙ্গে কেশোয়ানির নিবন্ধের একটা অংশ উল্লেখ করাই হয়তো যথেষ্ট হবে। ‘‘১৯৮২-র ২১শে ডিসেম্বর, তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী তারা সিং বিযোগীকে রাজ্য বিধানসভায় কার্বাইড নিয়ে ঘোরতর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। যদিও তিনি বিধানসভাকে আশ্বস্ত করেছিলেন এই শুনিয়ে যে, বিষাক্ত গ্যাসে কোনো বিপদের ঝুঁকি নেই। তিনি জানান, নিরাপত্তার কারণে কারখানায় বড় বড় ঝরণা তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, এর জন্য কাচের যন্ত্রপাতি লাগানো হয়েছে। তিনি বুঝিয়ে বলেন, কাচ ভেঙে দিলেই আপনা আপনি ঝরণা চালু হয়ে যাবে এবং গ্যাসের বিষাক্ত প্রভাব প্রশমিত হবে।
কিন্তু কোম্পানি সূত্রেই খবর আদতে গ্লাস ভাঙলেও সাইরেনও বাজেনি, ঝরণাও চালু হয়নি। কার্বাইড সংস্থা একটা নিরাপত্তা সপ্তাহ পালন করেছিল। বিযোগী নিজে সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানকার আধিকারিকরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, কাচ ভাঙলেই সাইরেন বাজবে। বিযোগী নিজে কাচ ভেঙেছেন, কিন্তু সাইরেন বাজেনি। তা সত্ত্বেও যে কিসের ভিত্তিতে উনি মনে করে নিলেন যে ঝরণা চালু হয়ে যাবে তা স্পষ্ট নয়।’’
এসবের যে কিছুই সি বি আই জানতে পারেনি তা তো নয়। সি বি আই নিজেরই পেশ করা হলফনামায় জানিয়েছে, চুরাশির ২রা ডিসেম্বর রাতেঐ কারখানার সেফটি সিস্টেমের ছ’টাই খারাপ ছিল। আর সাইরেন বন্ধ করে রাখা ছিল। সি বি আই-র সেই প্রথম চার্জশিটে অ্যাণ্ডারসনসহ ১২জনের বিরুদ্ধেই ৩০৪(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। অনিচ্ছাকৃত খুনের সেই অপরাধ প্রমাণ হলে ১০বছর কারাদণ্ড হতে পারতো, যদিও সেই সাজাও এদের যথেষ্ট নয়। কেন্দ্রের সরকার ও ইউনিয়ন কার্বাইডে প্রাথমিক সমঝোতা মতো ক্ষতিপুরণ ধার্য হয়েছিল ৪৭কোটি ডলার। সঙ্গে শর্ত গ্যাসকাণ্ডের জন্য দায়ী তাদের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা তুলে নেওয়ার। ১৯৮৯-এ সুপ্রিম কোর্ট নিজেই সেই অভিযোগ খারিজ করে দেয়। আবার নিজের রায় পুনর্বিবেচনা করে ১৯৯১-তে ফের মামলা শুরু করে। আবার ১৯৯৩-র ১৩ই সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ৩০৪(২) ধারার বদলে ৩০৪(ক) ধারায় মামলা করতে নির্দেশ দেয়। কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গলদ ছিল জানার পরও এই রায়, আবার সি বি আই-রও সেই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য কোনো আবেদন না জানানো— কোনোটাকেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।
একটা কথা বলতেই হচ্ছে, এযাবৎ ইউনিয়ন কার্বাইডের কৌশলটাই ছিল উৎকোচ কিংবা হাত ধুয়ে ফেলা। দায় এড়াতে ধাপে ধাপে ওরা সংস্থার বেশিরভাগ অংশটাই ডাও কেমিক্যাল বা অন্যান্যদের বেচে দিয়েছে। ৪৭কোটি ডলারের যে আর্থিক সমঝোতা কেন্দ্রের সঙ্গে করেছে তা তো আসলে মৃত, পঙ্গু বা অসুস্থ প্রতি পাঁচজন মাথাপিছু একজনের হিসেবে। এক একজন পনেরো হাজারেরও কম টাকা পেয়েছেন। আরে, অ্যাণ্ডারসন তো গল্ফ ক্লাবের মেম্বারশিপ রাখতে বছরে যা খরচ করেন, তাও ভোপালের এই মাথাপিছু ক্ষতিপূরণের চার-পাঁচ গুণ।
আসলে বহুজাতিকের হাত বিশেষ করে মার্কিন হাত তখন থেকেই অনেক লম্বা হতে শুরু করেছে। না হলে কি আর জাতীয় নিরাপত্তাকে থোড়াই কেয়ার করে সামলা হিলসে একেবারে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের গাঁ ঘেঁষে তৈরি হয়ে যায় শুধুমাত্র ইউনিয়ন কার্বাইডের বিলাসবহুল গেস্টহাউসই নয়, তাদের একটা রিসার্চ-ডেভেলপমেন্ট সেন্টারও। যে দু’জায়গা থেকে পাখির চোখে গোটা ভোপাল শহরটাকেই দেখা যায়।
তাই প্রশ্ন তুলে লাভ নেই, কেন ১৯৮৩-তে কংগ্রেসের আঞ্চলিক সম্মেলনের সময়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের থাকার জন্য বেছে নেওয়া হয় মুখ্যমন্ত্রীর অতি প্রিয় সেই কার্বাইড গেস্ট হাউসকে, সম্মেলনের জন্য ব্যবহৃত একমাত্র বেসরকারী গেস্ট হাউস। হাত লম্বা করতে বিভিন্ন মহলকে নিজের দিকে নিয়ে আসতে নতুন নতুন কৌশল নিয়েছে ইউনিয়ন কার্বাইড। ঠিক যেভাবে ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির জন্য সরকারের সঙ্গে এদেশের একাংশ গলা ফাটাতে শুরু করেছিল। সেই জাল বিছোতেই তাই ভোপালের অতি পরিচিত প্রভাবশালী এক ডাক্তারকেই তুলে দেওয়া হয় মেডিক্যাল লিগাল অ্যাডভাইসারের দায়িত্ব। রাজ্য পুলিসের প্রাক্তন আই জি রাম নারায়ন নাগুকে দেওয়া হয় নিরাপত্তার দায়িত্ব। রাজ্য মন্ত্রিসভার তৎকালীন দুই সদস্য নরসিংরাও দীক্ষিত ও দিগ্বিজয় সিংয়ের ভাইপো-ভাগ্নেরা বনে যায় কোম্পানির পি আর ও।
এই সমস্ত আঁতাতই দিনে দিনে আরো দৃঢ় হয়েছে। ক্রমেই ফাঁস হচ্ছে, প্রস্তাবিত পরমাণু দায়বদ্ধতা বিলে পরমাণু জ্বালানি সরবরাহকারী এবং বিদেশী চুল্লি নির্মাতাদের যেটুকু ‘দায়বদ্ধতা’ ছিলো, তা—ও সরিয়ে নিতে চলেছে মনমোহন সরকার। দুর্ঘটনা ঘটলে চুল্লির উপাদান সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের যে সুযোগ বিলের প্রথম খসড়ায় ছিলো (৪৫কোটি ডলার, ভোপাল ক্ষতিপূরণের চেয়েও কম), স্পষ্টতই মার্কিন চাপে তা প্রত্যাহার করেছে ভারত সরকার।
সাধনারা অনেক দিন ধরেই বলছেন, আসলে সরকার এটা করতে চায় বলেই ভোপালকে ধীরে ধীরে লঘু করা হয়েছে। তা না হলে যে পরমাণু দুর্ঘটনাকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে দেখানো যাবে না।
No comments:
Post a Comment