কাশ্মীর কেন পাথর ছুঁড়ছে?
চন্দন দে
ফেসবুকে গিয়ে ‘কৌশর-হাতিয়ার-কানি-জঙ’ অথবা ‘অল কাশ্মীর স্টোন পেল্টার অ্যাসোসিয়েশন’ লিখে সার্চ মেরে দেখতে পারেন। শ’তিনেক ফ্যানকে দেখতে পাবেন। প্রস্তর-শক্তির তেমনই এক বিক্ষোভকারীর প্রশ্ন ‘ভারত যদি আমাদের বুলেট ছোঁড়ে, আমরা কি তবে পাথর ছুঁড়তে পারি না?’
খটকা লাগলেও কিছু করার নেই।
‘নব্য প্রস্তর যুগে’র কাশ্মীরে এটাই হকিকত। আজকের কাশ্মীরে যখন ‘আজাদি’র কথা উঠছে, তখন ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার জোরালো অস্ত্র হিসেবে পাথরই বেছে নিয়েছে এক অংশের তরুণ প্রজন্ম। ওঁদের কথাতেই, ‘বন্দুকের দিন শেষ।’
এই প্রজন্মেরই হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে। তখন ঐ একই সংখ্যক ছেলেমেয়ে ই-মেল, ফেসবুক, ইউটিউবে নিজেদের চিন্তা ও কাজের সংযোগ রচনা করে চলেছে।
রাজ্যের ব্ল্যাকবেরি পাগল মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা (নিন্দুকেরা বলে, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মধ্যেও ওমরের আঙুলগুলি ব্ল্যাকবেরি নিয়ে খেলা করে চলে) যখন বারেবারেই সাম্প্রতিক পাথর ছোঁড়ার ঘটনা বিরোধীদের উসকানিতেই বলে অভিযোগ আনছেন, তখন এই নতুন প্রজন্ম ইন্টারনেটকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক ভাবেই।
ওপরের দুটি ফোরাম সেই আন্দোলনের পাশে থাকা যুবক-যুবতীদেরই তৈরি।
জাভেদ আহমেদ মাল্লা অবশ্য ইন্টারনেট চালাতে জানতো না।
জাভেদ আহমেদ মাল্লা, ঠিক দিনমজুর বলা যাবে না। কাজ করতো শহরতলীর এক ব্যাগ ফ্যাক্টরিতে। মাস-মাইনের সেমি-স্কিলড লেবার। পুরোনো শ্রীনগরেই থাকতো ওঁর তুতো-ভাই রফিক আহমেদ বাঙরু। সি আর পি এফ-এর গুলিতে বাড়ির সামনের রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়েছিল বছর সাতাশের রফিকের নিথর দেহ। আর তার পরদিন কাজে ছুটি নিয়ে ভাইয়ের জেনাজা (শোকমিছিল)য় পা মিলিয়েছিল জাভেদ। বাঙরুর শেষকৃত্য সেরে ফেরার পথেই বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালালো সি আর পি এফ-এর বাঙ্কারে। আবার গুলি চললো। এবার মারা গেল ছাব্বিশের যুবক জাভেদ।
এভাবেই একের পর এক। বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিক্ষোভ। বেড়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে ধেয়ে আসা পাথরের সংখ্যাও।
কাশ্মীর ফের অগ্নিগর্ভ।
গত এক মাসে কাশ্মীর উপত্যকায় অন্তত কুড়ি জন যুবক-কিশোরের প্রাণ গেছে। দফায় দফায় এই গণ্ডগোলের শুরু গত ১১ই জুন। রাজৌরি কদল এলাকায় বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিসের ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাসের শেল ১৭বছরের তুফাইল আহমেদ মাট্টুর মাথায় লেগে খুলিটাকে ওর ধড় থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
আর সেই থেকে কাশ্মীরের নগর পথ দেখেছে কেবল পুলিস আর বিক্ষোভকারীদের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঢেউ। দেখেছে, জনতার প্রতিবাদ মিছিল। দেখেছে, বিক্ষোভ লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুঁড়ছে পুলিস। নির্বিচারে উড়ে আসছে বুলেট। লুটিয়ে পড়ছে দেহ। দেখেছে, সেই গুলি চালানোর প্রতিবাদে আবার মিছিল। জবাবে ফের গুলি। দেখেছে, জনতার পালটা ইট-পাথর ছোঁড়া। দেখেছে, আক্রমণের পালা বদল। দেখেছে, প্রতিবাদী মানুষের মারমুখী হয়ে ওঠাও। দেখেছে, রাজপথে পড়ে মাথায় হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটধারী পুলিসকর্মীকে অসহায় মার খেতে। রাস্তায় পড়ে দু’হাত তুলে কোনও মতে বাঁচার চেষ্টার সেই ছবির সঙ্গে কাশ্মীর এই সময়কালেই দেখেছে কাঁধের কালাশনিকভও মুছে দিতে পারেনি ঊর্দিধারীর চোখ-মুখের আতঙ্ক।
যে যুবকরা পুলিস পেটাচ্ছে বা কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ছে তাদের কাছে মাট্টু তাদের লড়াইয়ের শহীদ। স্কুল ফেরতা মাট্টু কিন্তু শহীদ হতে চায়নি, যায়নি বিক্ষোভ দেখাতেও। ওর প্রিয়জনেরও তেমন ইচ্ছা নেই। ‘আকস্মিক শহীদ’-এর বাবা মহম্মদ হুসেন মাট্টু যেমন ভদ্রভাবেই আপত্তি জানিয়েছিলেন যখন বিক্ষোভকারীরা তাঁর ছেলের দেহ মিছিল করে নিয়ে যেত চেয়েছিল মাজার-ই-শৌধে। এখানেই সমাধিস্ত কাশ্মীরের বহু লড়াই-আন্দোলনের শহীদরা। শেষ পর্যন্ত মহম্মদ হুসেন অবশ্য হার মেনেছেন, কিন্তু টেলিভিশনের সামনে এও জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর ছেলের মৃত্যুর পর এই হাঙ্গামায় তাঁর সায় নেই।
বাকি ‘শহীদ’ পরিবারেরও অনেকে একই পথ নিয়েছে। যেমন যে মহম্মদ রফিক বাঙরুর শোকমিছিলে গিয়ে মরতে হয়েছে জাভেদ মাল্লাকে, সেই রফিকের জেনাজার গন্তব্য তার পরিবারের প্রথা মেনেই সাফা কদলের দানা মাজার। গত ৫ই জুলাই নিরাপত্তা জওয়ানদের তাড়া খেয়ে নদীতে ডুবে প্রাণ গেছে মুজফ্ফর আহমেদ ভাটের। তার বাবা-মা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা যখন তাদের ছেলেকে মাজার-ই-শৌধে সমাধিস্ত করার কথা বলেন, বিনয়ের সাথেই তাঁরা সেই ‘অনুরোধ’ প্রত্যাখান করেছেন। ভাটের কয়েক ঘন্টা পরই ‘শহীদ’ ফৈয়াজ আহমেদ ওয়ানির পরিবারও একই পথ নিয়েছেন।
প্রত্যাখানের এই গল্পের সঙ্গে হয়তো কাশ্মীরের পথ-বিক্ষোভের ছবিটা অনেকটাই বেমানান। জুলাইয়ের শুরুতে তো পরিস্থিতি এতটাই বিগড়ে গেলো যে নাগরিক বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সেনা নামাতে হলো শ্রীনগরে, পনেরো বছর পর। বোঝা গেলো, পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্যের ওমর সরকার তো ব্যর্থই। সঙ্গে দিশেহারা কেন্দ্রের ইউ পি এ সরকারও। একথা ঠিকই নিরাপত্তা বাহিনীর বাড়াবাড়ি যেমন একটা দিক, তেমনই সুযোগ পেলেই আগুনে ঘি ঢালার জন্য তৈরি থাকে ইসলামী মৌলবাদীদের উসকানি।
দুটো বিষয়কে কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না।
এক, ২০০৮-এর বিধানসভা নির্বাচন। অমরনাথ জমি বিতর্কের সূত্র ধরে কংগ্রেস-পি ডি পি জোট সরকারের পতন, রাজ্যপালের শাসন— তার পরও জম্মু-কাশ্মীরে ভোট পড়লো ৬০শতাংশেরও বেশি। দেশের বাণিজ্য নগরী শিক্ষিত-সচেতন নাগরিকদের মুম্বাইয়ে যেন গড়ে কত ভোট পড়ে? কমিশনের হিসেবে ২০০৯ লোকসভায় ভোট পড়েছে ৪৪% আর সে বছরের অক্টোবরে বিধানসভা নির্বাচনে ৫২শতাংশ।
দুই, মাঝেমধ্যে তাদের হাজিরার জানান দিতে বিচ্ছিন্ন কিছু হামলার চেষ্টা ছাড়া গত তিন-চার বছরে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদী, স্তর ও সংখ্যার বিচারে উভয়েই কমতির দিকে।
সরকারী ভাবেই বলা হচ্ছিল, উগ্রপন্থী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। সামরিক বাহিনী হিসেব দিচ্ছিল, উগ্রপন্থীর সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা কঠোর নিরাপত্তা বলয় দিয়েই এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে। সেনা ও আধাসেনা মিলিয়ে প্রায় ৩লক্ষ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার হিসেবে, ইরাকে ১৬৬জন মানুষ পিছু একজন সেনা। আর কাশ্মীরে? প্রতি কুড়িজনের জন্য একজন জওয়ান বরাদ্দ, মানে প্রায় আট গুণ।
এমন অনুকুল আবহাওয়ায় সরকারের উচিত ছিল পরিস্থিতিতে লাগাম টানা। সমস্ত রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে আলোচনায় বসা। কিন্তু সামনে অমরনাথ যাত্রা। যাত্রীদের ওপর হামলা হলে তো আগুন আরো ছড়িয়ে পড়বে। তাই পনেরো বছর পর ব্যারাক থেকে সেনা বেরোলো শ্রীনগরের রাস্তায়।
অথচ গণ্ডগোল কেবলমাত্র শহরের কিছু পকেট এলাকায়, গোটা কাশ্মীর উপত্যকায় নয়। আবার এটা কোনো নতুন সমস্যাও নয়। ২০০৬ থেকে লাগাতার এভাবেই প্রাণ কাড়ছে কোনো না কোনো সংঘর্ষ। কোনো কোনো বছর তো এবারের থেকেও বেশি গণ্ডগোল হয়েছে। একে শহুরে বিক্ষোভ বললেও হয়তো খুব একটা ভুল হবে না।
পুলিসের রেকর্ড কী বলছে? এবছরের ১লা জানুয়ারি থেকে ৭ই জুলাই পর্যন্ত পুলিসী অ্যাকশনে যে ২১জন নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে তার অর্ধেকের বেশিই শ্রীনগরের বাসিন্দা। যে ৭২নাগরিক জখম হয়েছেন, তার বত্রিশ জনই এ শহরের। পুলিসের সেই রেকর্ডে আরো জানা যাচ্ছে, এই সব সংঘর্ষে তাদের ১৪১জন অফিসার এবং সি আর পি এফ-এর ৬২জন জখম হয়েছেন। মানে গোটা কাশ্মীরে মোট জখম ৬২৩-এর এক-তৃতীয়াংশই শ্রীনগরের। ঐ তারিখের মধ্যে পুলিসী রেকর্ডে কাশ্মীরজুড়ে ২৬৯টি হিংসাত্মক সংঘর্ষের খবর আছে। এর ৪৫শতাংশই শ্রীনগর শহরে ঘটেছে। তাও বেশিরভাগটাই শহরের পাঁচটি থানা এলাকায়— রাণিওয়াড়ি, নউহাট্টা, মহারাজগঞ্জ, খানিয়ার ও সাফা কদল।
শ্রীনগরের বাইরে উত্তর কাশ্মীরের ছোট শহুরে গঞ্জগুলিই সংঘর্ষের সাক্ষী। যেমন বাণিজ্যের শহর বারামুলায় সংঘর্ষ ৪৬টি। পাশেই সোপোর, আপেল ব্যবসার কেন্দ্র। জামাত-এ-ইসলামির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত সোপোরে এই ব্যবধানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ২১টি। এই তিনটে শহরেই এই গ্রীস্মের ৭০শতাংশ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
২০০৯-এর ছবিও একইরকম ছিল। সে বছর কাশ্মীরে মোট সংঘর্ষের সংখ্যা ছিল ২৯০টি। যার মধ্যে ৬৪টি শ্রীনগর, বারামুলা ও সোপোরের বাইরে। তারও আবার অধিকাংশটাই ঘটেছিল সেই সোপিয়ানে। সেখানকার দুই মহিলার ধর্ষণ-খুন নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল গোটা দেশ।
বোঝা তো গেল, কোথায় কোথায় গণ্ডগোল। কিন্তু কারা করছে? কারা এই বিক্ষোভকারী? ওদের কী লক্ষ্য? কে এদের নেতা? কোন শক্তিতে বছর পনেরো থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের নিরস্ত্র যুবকের দল সি আর পি এফ বা সেনাবাহিনীর উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্রের মোকাবিলা করছে স্রেফ পাথর ছুঁড়ে?
পাথর ছোঁড়ে যারা, তাঁদের নিয়ে মতামতের অভাব নেই। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পি চিদাম্বরম জোর গলায় বলছেন, এদের পেছনে লস্কর-ই-তৈবা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বলছেন, এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাত রয়েছে। এক পুলিস আধিকারিক আবার অভিযোগ করছেন, পয়সা দিয়ে পাথর ছোঁড়ানো হচ্ছে।
অথচ শ্রীনগর উপকন্ঠে বা তার অন্দরমহলের পরিস্থিতি সরকারী এই উপলব্ধিকে মনে গেঁথে নিতে মোটেই সাহস যোগাতে পারছে না। কেউ চোখ বন্ধ করে এই সব যুক্তি মেনে নিতে পারছে না। আসলে বহুদিন ধরেই অমীমাংসিত কাশ্মীর বিতর্ক। ক্ষোভ, অসন্তোষ, হতাশা মিলে জন্ম দিচ্ছে হিংসার। বেশির ভাগ হাঙ্গামা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে শ্রীনগরের শহর-ই-খাস এলাকায়। এ হলো সেই জায়গা যা শহরের সনাতনী ব্যবসা কেন্দ্র। পাথর ছুঁড়ছে যারা, তারা একসময়ে সমাজের প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান, গত দু’দশকে যাদের অবক্ষয় হয়েছে। এদের কেউ দোকান কর্মী, কেউ অটোচালক, কেউ স্কুল ড্রপ-আউট, কেউ আবার এখনো কোনো কাজ খুঁজে পায়নি। এরা হতাশ একটা প্রজন্ম। ব্র্যান্ডেড জিনস, স্নিকার পরিহিত দামী মোবাইল হ্যাণ্ডসেট কানে শিক্ষিত এই যুবকরা নিজেদের পাথর ছোঁড়াকে ‘স্বাধীনতার লড়াই’ বলতে পছন্দ করছে। স্থানীয় কলেজের স্নাতক এমনই এক যুবকের কথায়, ‘আজাদির জন্য আমরা পাথর ছুঁড়ছি। টাকা-পয়সার জন্য নয়। কিন্তু আমি সন্ত্রাসবাদী নই, আমি তো আর বন্দুক হাতে তুলে নিইনি।’ এমনই একজন বাদশা, কখনও কোনো সংঘর্ষে জখম না হওয়ায় বন্ধুরা এখন ওকে ঐ নামেই ডাকে। ২০০৮-এ পুলিসের গুলিতে নিজের এক বন্ধুকে হারানো সেই বাদশার কথায়, ‘পাথর ছোঁড়াই হলো প্রতিরোধের খাঁটি রূপ। বন্দুক-সংস্কৃতি এখন অতীত।’
টাকা পয়সার ছড়ানোর অভিযোগ তোলা হলেও, এখনও পর্যন্ত তেমন তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। আবার প্রতিবাদের চরিত্র দেখেও মালুম হচ্ছে না কোনো এক বা একাধিক সংগঠন এদের নিয়ন্ত্রণ করছে।
স্বাধীনতার সময়ে ১৯৪৭-এ এই শহর-ই-খাস প্রত্যক্ষ করেছিল মীরওয়াইজ মহম্মদ ফারুক আর ন্যাশনাল কনফারেন্সের তীব্র লড়াই। সেই লড়াইটা ছিল পুরোনো বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে ঠিকাদার, ব্যবসায়ীদের নব্য অভিজাত শ্রেণীর। ১৯৮৬তে আবার এরা হাত মেলালো। মীরওয়াইজ ফারুক বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করতে অস্বীকার করলেন। তিন বছর পর যখন জেহাদি সন্ত্রাস শুরু হলো তার দাম চোকাতে হলো মীরওয়াইজকে। ১৯৯০-র মে মাসে খুন হলেন মীরওয়াইজ। সেই মীরওয়াইজ ফারুক আর তাঁর আততায়ী আবদুল্লা বাঙরু দু’জনেই সমাধিস্ত মাজার-ই-শৌধে। সেই মাজার-ই-শৌধ—শহীদের সমাধিভূমি।
সেই মীরওয়াইজের পুত্র মীরওয়াইজ ওমর এখন ফারুক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ছত্রী সংগঠন হুরিয়ত কনফারেন্সের মূল নেতা। পরের পর তাঁর নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত শহর-ই-খাসে এক ঘোলাটে রাজনৈতিক বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছে। তাঁর সমস্ত ফোকাসটাই ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথে রাজনৈতিক ক্ষমতা। অথচ তাঁর অঞ্চল থেকে গেছে একই জায়গায়। বেরোজগারি, কর্মসংস্থান এসব অনুচ্চারিত থেকে গেছে। ভোট কম পড়ে। সেই নামমাত্র ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসে ন্যাশনাল কনফারেন্সের বিধায়ক। তাঁদের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে গেছে। রাজনৈতিক নেতাদের এই ব্যর্থতা শুধুমাত্র যুবদের হতাশ করেছেই তা নয়, বরং খেপিয়ে তুলেছে ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। এই ফাঁকটাই জায়গা করে নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন ও লস্করের মতো জেহাদি সংগঠনগুলি। কাশ্মীরে ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস অবশ্য সুদীর্ঘ। নির্বাচনী ক্ষমতা দখলে জাতিগত ও ধর্মীয় ভাবাবেগ, দুশ্চিন্তাকে মিশিয়ে দিতে নিপুণ জামাত-এ-ইসলামি।
তবে এই যে পথের সংঘর্ষ, এসবের শুরু আবার ২০০৬সাল থেকে। এটা কেবল মাত্র সংগঠিত রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখাই নয়, পুরোনো রাজনৈতিক ধারণাকে সজোরে ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টাও বলা যেতে পারে।
এই সুযোগটাই কাজে লাগালেন কাশ্মীরে ইসলামের ধ্বজাধারী সৈয়দ আলি শাহ গিলানি। সেই গিলানি ২০০৮-এ এক সাক্ষাৎকারে যিনি বলেছিলেন, ‘ওসামা, আরে ও তো মাত্র কয়েক বছর হলো এসেছে। আমাদের মতো লোকজন তো সারা জীবন ধরে এই লড়াই লড়ে চলেছে।’ গিলানির এই দাবি অবশ্য পুরোপুরি ঠিক নয়। একটা সময় কাশ্মীরের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভালোভাবেই জুড়ে ছিলেন গিলানি। জামাতের টিকিটে সোপোর থেকে নিয়মিত জিততেনও। ১৯৮৯-এ কাশ্মীরে জেহাদ শুরু হওয়ার পর অনিচ্ছা নিয়েই মদত দিয়েছিলেন। তবে ২০০৫-এ সাফল্যের সঙ্গেই এই গিলানি হুরিয়ত কনফারেন্সে ভাঙন ধরাতে পেরেছিলেন।
আর তাঁর সেই সাফল্যের মধ্যেই শ্রীনগরের রাস্তার খণ্ডযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র লুকিয়ে রয়েছে।
ফিরে যাওয়া যাক ২০০৪-এ। সেবছর ‘র’-এর বিশেষ বিমান গিলানিকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁর কিডনি থেকে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারটা কেটে তাঁকে স্বস্তি দিলেও একই সঙ্গে তার নিজের সংগঠন জামাতে তাঁর অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছিল। জামাতে গিলানি যখন কোণঠাসা, ঠিক তার পরের বছরই মীরওয়াইজ ওমর ফারুকের হুরিয়ত দিল্লির সঙ্গে আলোচনায় বসে পড়লো। যে ওমর ফারুক এতদিন পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো আলোচনায় সায় দিচ্ছিলেন না, তার হঠাৎ আলোচনার টেবিলে বসা নিয়ে তাই চমক তো থেকেই গেলো।
আবার হুরিয়তের এই দিল্লির সঙ্গে আলোচনায় বসার পেছনে পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পি ডি পি)-র মধ্যে বেশ কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার ঢুকে পড়ার একটা প্রভাব হতেই পারে। যেমন জে কে এল এফ-এর সর্বোচ্চ পরিষদের প্রাক্তন সদস্য পীর মনসুর হুসেন এখন মেহবুবা মুফতির রাজনৈতিক উপদেষ্টা। জামাত-এ-ইসলামির প্রাক্তন প্রধান গুলাম মহম্মদ ভাটের ভাই আবদুল খালিক ভাট সোপোরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। মীরওয়াইজ ফারুকের বিশ্বস্ত সহচর মহম্মদ ইয়াকুব ভকিলও ক্ষমতার খোঁজে পি ডি পি-তে যোগ দিয়েছেন।
ফিরে আসা যাক আবার ২০১০-এ। পুলিসের সঙ্গে সংঘর্ষের জন্য লোকজনকে উসকানোর কাজ যে গিলানির তেহরিক-ই-হুরিয়ত করছে, এমন প্রমাণ আছে। যদিও তাদের রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এত বিশাল নয় যে এত বড় মাপের গণ্ডগোল তারা বাঁধিয়ে দিতে পারবে। তবে মাসরাত আলম ও শাকিল বকসির মতো মাঝারি সারির ইসলামী নেতারা মসজিদের মাইক থেকে শুরু করে যত রকমভাবে মিছিলে লোক নিয়ে যাওয়া যায় তার ব্যবস্থা করছেন।
২০০৬সাল থেকে একের পর এক এই ধারার বিক্ষোভ দেখে সনাতনী ধর্মীয় নেতারা খানিকটা শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন, এই ধরন চলতে থাকলে তাঁদের প্রভাব কমতে পারে। জামাত আল-এ- হাদিসের সভাপতি শৌকত আহমেদ শাহ ঘোষণা করলেন, ‘খোদ হজরত মহম্মদ বলে গেছেন, পাথর ছোঁড়া ইসলাম-বিরোধী।’ তাঁকে সমর্থন করলেন মীরওয়াইজ ফারুক, মুফতি মহম্মদ বসিরুদ্দিনের মতো লোকজন।
কিন্তু ফুঁসে উঠলেন নব্য ইসলামের প্রবক্তারা। গিলানি বললেন, ‘এটা খুবই স্বাভাবিক যে পাথর ছুঁড়ে যুবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছে। ইসলামিক স্টুডেন্টস লিগের নেতা শাকিল বকসি তো এই ধরনের প্রতিবাদকে ‘প্যালেস্তাইনের ইন্তিফাদার কাশ্মীরী সংস্করণ’ বলে দাবি করে বসলেন।
মীরওয়াইজ ফারুক বা সজ্জদ গণি লোনের মতো নেতারা কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসে মধ্যপন্থার কথা বলছিলেন। তাঁদের কথায়, ‘সবকিছু থাকা’ আর ‘কিছুই না থাকা’-এর মাঝেও একটা শব্দবন্ধ আছে তা হলো, ‘খানিকটা থাকা’।
সেই ‘খানিকটা’ নিয়ে যখন সন্তুষ্ট থাকার দাওয়াই দিচ্ছিলেন ফারুকরা, তখন গিলানিরা সুর আরো চড়া করছিলেন, সঙ্গে মৌলবাদী ভাবধারা ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। কাশ্মীরের উগ্রপন্থায় ক্রমশ প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলা হিজবুল মুজাহিদিনের প্রধান মহম্মদ ইউসুফ শাহ তো গিলানিকে ‘আমাদের লড়াইয়ের মুখ’ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে বসলেন। উৎসাহিত গিলানির দলবল আরো চড়া সুরে সাম্প্রদায়িকতার বিভাজন রেখা টানতে শুরু করলেন।
২০০৬-এ শ্রীনগরে ‘মধুচক্র’-র খোঁজ মেলার পর এরা বলতে শুরু করলেন ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতা চাপিয়ে দিয়ে কাশ্মীরের ইসলাম চরিত্র নষ্ট করার চক্রান্ত চলছে। ২০০৭-এ তাবিন্দা গণি নামে এক কাশ্মীরী কিশোরীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে ব্যবহার করা হলো রাজ্যে অন্যরাজ্যের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে উসকে দিতে। একটা জেনোফোবিয়া তৈরি করতে। এমন সব প্ররোচনামূলক বক্তব্য রাখা হলো খোদ শ্রীনগরেই অন্য রাজ্যের শ্রমিক বোঝাই বাসের ওপর বোমা মারার ঘটনা ঘটলো।
সোপিয়ান কাণ্ড নিয়ে যখন উত্তাল হলো উপত্যকা, তার কদিন আগে সেই সোপিয়ানের ১০কিলোমিটার দূরের কেলারে হিজবুল মুজাহিদিনের উগ্রপন্থীরা নিগীনা আওয়ান নামে এক তরুণীকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে খুন করলো। গত বছরের ৩রা জুন সেই খুনের কয়েক ঘন্টা পরই মেহবুবা মুফতি সোপিয়ান কাণ্ডের প্রতিবাদে সভা করতে গেলেন সোপিয়ানে। অথচ আওয়ানের বাড়িতে কেউ গেলোই না। সেও ছিল হাই স্কুলের ছাত্রী। অথচ উগ্রপন্থীদের চোখ রাঙানিতে আওয়ানের বাবাকে শেষকৃত্য ছাড়াই মেয়েকে কবর দিতে হয়েছে। তার মাসখানেক আগে পালিপোরায় লস্কর উগ্রপন্থীদের হাতে একইভাবে খুন হলেন ৬০বছরের বৃদ্ধা রেশমা আওয়ান। মাকে বাঁচাতে গিয়ে রেশমার ছেলে মহম্মদ আসলাম আওয়ান গুলি খেলো। পাথর ছোঁড়া তো দূর-অস্ত, উপত্যকায় কেউ টুঁ শব্দ পর্যন্ত করলো না।
বিষিয়ে দেওয়া এমন প্রচার আর প্রতিকুল পরিবেশে শেষ পর্যন্ত নব্য ইসলামবাদীরা হুরিয়তকে আলোচনার টেবিল থেকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হলো। নয়াদিল্লির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে কোনো লাভ নেই, গিলানির বহুদিনের এই দাবির সঙ্গে সহমত জানালেন মীরওয়াইজ ফারুকও। গিলানিকে ছাড়া কোনো আলোচনায় না যাওয়ার ব্যাপারে তিনি সেসময় একমত হন।
তবে ২০০৮-এর শেষ পর্যন্ত সে চুক্তি টিকলো না। উগ্রপন্থীদের চোখ রাঙানিকে পাত্তা না দিয়েই কাশ্মীর ঢেলে ভোট দিলো। এরই মধ্যে দিল্লির প্রতিনিধির সঙ্গে মীরওয়াইজ ফারুক বেশ কয়েক দফা আলোচনায় বসলেন। পাশাপাশি চিদাম্বরমের সঙ্গেও মুখোমুখি আলোচনায় বসলেন। কিন্তু শান্তি প্রক্রিয়া এগোলো না এক কদমও।
এবছর যখন আবার পাথর ছোঁড়া শুরু হলো, মীরওয়াইজ ফারুক ও গিলানি উভয়েই অবশ্য যুবকদের আরজি জানালেন এসব থেকে বিরত থাকার জন্য। কিন্তু লাভ হয়নি কিছুই। থামেনি পাথর ছোঁড়া। এই হাঙ্গামা থামাতে কাশ্মীরের নেতাদের এখন ভিন্ন ভাষার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। রাজ্যের প্রাক্তন উপ মুখ্যমন্ত্রী মুজফ্ফর হুসেন বেগের কথায়, ‘এরা তো কারোর কথাই শোনে না।’ আইনমন্ত্রী আলি মহম্মদ সাগরের কথায়, ‘পাথর ছোঁড়া তো এখন একটা ইন্ডাস্ট্রি।’ শ্রীনগরের রাজপথে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে তরুণ কাশ্মীরীরা যখন গুলিতে প্রাণ দিচ্ছে, ক্রুদ্ধ মীরওয়াইজ তখন বলছেন, ‘স্বাধীনতার ব্যাটনটাই তো এখন তরুণ প্রজন্মের হাতে চলে গেছে।’ মেহবুবা মুফতির খেদ, ‘মূলস্রোতের রাজনীতিকরা তো এখন কোণঠাসা। আমরা উদ্বিগ্ন। আমাদের নেতারা বাইরে বেরোতে পারছে না। লোকে আমাদের হিন্দুস্তানি কুত্তা বলে।’ পাথর ছোঁড়া ঐ যুবকের দলের কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার হুকুমদারিও না-পসন্দ।
এই দেওয়াল লিখন কি পড়তে পারছে কেন্দ্রের ইউ পি এ সরকার? ওদের একমুখী নীতি বরং পরিস্থিতিকে আরো বিগড়ে দিচ্ছে। পথচলতি মানুষের দিকে বন্দুক তাক করে বোঝানোর চেষ্টা চলছে আসল ক্ষমতা কার হাতে। সীমান্ত পারের সন্ত্রাস রুখতে ব্যর্থ রাষ্ট্র ব্যস্ত সাধারণ মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা তছনছ করতে। যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণেই এত ক্ষোভ তা আরো কঠোর করে প্রয়োগের পথেই হেঁটেছে দিল্লি।
অথচ এই অসন্তোষ প্রশমনের আন্তরিক চেষ্টা চালালে হয়তো কিছু লাভ হতো।
শুধুমাত্র শ্রীনগর-মুজফফরাবাদকেই জুড়লেই চলবে না। প্রশ্ন হলো, শ্রীনগর-দিল্লির দুরত্ব কমাবে কে?
No comments:
Post a Comment