Saturday, May 1, 2010

VOTER KATHA II

যন্ত্রণার ভোপাল

চন্দন দে

MP-BHOPAL019

ভোপাল, ২১শে নভেম্বর — রাত তখন সাড়ে বারোটা হবে। বাচ্চাটা কাঁদছে, ঘুম ভেঙে গেল। আধা অন্ধকারেই ঠাওর হলো ঘরটা একটা সাদা ধোঁয়ায় ভরে গেছে। লোকে চিৎকার করছে— ভাগো ভাগো। আমারও কাশি শুরু হলো। মনে হচ্ছিল, যেন আগুনের মধ্যে শ্বাস নিচ্ছি। চোখ জ্বলে যাচ্ছিল।

কাঞ্চা কিরলির গ্যাস পীড়িত হাসপাতালের চাতালে বসে সেই ভয়ঙ্কর, বিভীষিকার রাত শোনাচ্ছিলেন আজিজা সুলতান। ছেলেটা সেদিন বাঁচলে বছর পঁচিশ বয়স হতো। আবার বাঁচলে হয়তো তাঁর মায়ের মতোই ‘অপায়িচ’ হয়েই থাকতে হতো। সারা শরীরে জ্বালা নিয়ে, বীভৎস এক চেহারা নিয়ে।

১৯৮৪-র ৩রা ডিসেম্বর রাতের সেই ‘গণহত্যা’য় বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে আরেকজন চম্পাদেবী শুক্লাও তখন ঐ চাতালে। বলছিলেন, ‘মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমাদের গায়ে লঙ্কার গুঁড়ো ছুঁড়ে দিচ্ছে। চোখ-নাক দিয়ে জল বেরোচ্ছে। আর শুধু কাশি।’

আর বেঁচে থাকা এই মানুষগুলির জন্যই লড়াই করে চলেছেন আবদুল জব্বরদের মতো কিছু মানুষ। পুরানা ভোপাল শহরে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে পৌঁছে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে। ছোট্ট কমপ্লেক্স ‘স্বাভিমান কেন্দ্র’। ভোপাল গ্যাসকান্ডে মৃত কিংবা অসুস্থ গরিব পরিবারগুলির মহিলারা সেখানে হাতে কলমে কাজ শিখছেন। চেষ্টা করছেন ঘুরে দাঁড়িয়ে আত্মনির্ভর হওয়ার।

সামনের বোর্ডে তালিকা ঝুলছে, এই আগস্টে কতজন কোন্‌ স্ট্রিমে পরীক্ষা দিয়েছেন। সেলাই—৪০, জরির কাজ—৮, কম্পিউটার—৪৪।

এখান থেকে বেরিয়ে কেউ নিজেই কিছু করার চেষ্টা করছেন , কেউ বা লেগে পড়ছেন কোনো বেসরকারী সংস্থায়।

তবু মন ভালো নেই জব্বরের। তবুও বিষণ্ণ জব্বর। ভোপাল গ্যাসকান্ডের পর এই নিয়ে সাতবার বিধানসভার ভোট হচ্ছে। কিন্তু ভোট প্রচারে কোথাও কেউ ঐ গ্যাসকান্ডের কথা উল্লেখ করছে না। সে মাঝপথে মুখ্যমন্ত্রিত্ব হারানো বি জে পি প্রার্থী বাবুলাল গৌরই হোক আর কংগ্রেসের বিভা প্যাটেল, শহরের প্রাক্তন মেয়র। শহরের রাস্তায় নতুন-পুরোনো চটুল হিন্দি গানের সুরে বি জে পি’র স্লোগান— ‘ক্যান্ডিডেট মজবুরি হ্যায়, শিবরাজ সিং জরুরী হ্যায়।’ অনেকটা সেই বাজপেয়ীর প্রচারের ঢঙে। খানিক আগেই প্রদেশ কংগ্রেস অফিসে দলীয় মুখপাত্রকে ভোপাল গ্যাসকান্ডের কথা তুলতেই অন্য কাজের ব্যস্ততায় জুড়ে গেলেন।

জব্বর হিসেব তুলে বলছিলেন, তিরানব্বইয়ের পর কেউ আর এই প্রসঙ্গ তোলেনি। সেই ভয়ঙ্কর রাত নিয়ে যেন কারও কোনো দাব নেই।

আসলে এখনও সেদিনের ঘটনার জন্য দায়ী ইউনিয়ন কার্বাইডের কারও শাস্তি হয়নি। নানা স্তরের আদালতে কেবল একটার পর একটা মামলা। এগোয়নি কিছুই। গ্যাসপীড়িতদের চিকিৎসা ও অন্যান্য পুনর্বাসনের জন্য সুপ্রিম কোর্টেও চলছে একাধিক মামলা।

এখনও বহু মানুষ গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ভুগছেন। ইউনিয়ন কার্বাইডের বিশাল দেওয়াল ঘেরা বন্ধ কারখানাতে এখনও মজুত নানা রাসায়নিক। তা মাটির তলায় জলে মিশে দূষিত করছে। কেমিক্যাল পড়ে রয়েছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের সাইকেল স্ট্যান্ডের কাছে। দেওয়ালে টাঙানো মানচিত্র বলছে অতল আয়ুব নগর, অন্নু নগর, রিশালদার কলোনি, চোলা নাকা, শক্তি নগর, জে পি কলোনি— এমন দশটা মহল্লার জলেই পারদের বিপজ্জনক মাত্রা। সব জেনেও ব্যবস্থা নেয়নি না কেন্দ্র, না রাজ্য। জব্বার জানলেন, বিকল্প নেই, বিষাক্ত জলই খাচ্ছে মানুষ।

এমন এক অবস্থার মধ্যেও ভোট এলেও গ্যাসকান্ড নিয়ে ভোপালে কোনো দলই কিছু বলছে না। শুধু জব্বরের ভোপাল গ্যাসপীড়িত মহিলা উদ্যোগ সংগঠন এখনও আদালতে আদালতে ঘুরে চলেছে।

চব্বিশ বছর অনেকটা সময়। ক্ষতিপূরণের ফয়সালা হবার পরে এপর্যন্ত ৫লক্ষ ৭৪হাজার মানুষ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। দু‘দফায় পঁচিশ-২৫, পঞ্চাশ হাজার। প্রথমবার ১৯৯৩-এ। তারপর ২০০৬-এ। এতগুলো বছর পরে ঐ টাকাগুলোর কীই বা মূল্য বলুন? সখেদে প্রশ্ন জব্বার। চুরাশির বাজারদরে ঐ টাকা আর কত ছিল— পাঁচ-সাত হাজার।

কংগ্রেস তো আগেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বি জে পি’র আবার সাম্প্রদায়িক নাক। গ্যাসপীড়িতদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পাওয়াদের মধ্যে গুণে দেখেছে বেশি মুসলিম।

তাই সাধ্বী প্রজ্ঞাকান্ডে বেসামাল ‘ইসলাম-সন্ত্রাসবাদের’ বড় বাজনদার আদবানির মুখে যখন ‘সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নেই’ বাণী শোনা যায়, তখন জব্বারকে খানিকটা বিরক্ত ঠেকে। বলেন, কে টেনেছিল বাবা, এই রেখা— তোমরাই তো। বলেন,এদের তো কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই— এরা শুধু গরিব মানুষ। বলেন, ‘শপিং মলের ঝাঁ চকচকে ভোপাল খবরই রাখে না— এক ভোপালকে অন্দর ঔর এক ভোপাল ভি হ্যায়।’

No comments:

Post a Comment