তবু ওরা ভোট দেন, দিতেই হয়
চন্দন দে
ভোপাল, ২২শে নভেম্বর — লালুপ্রসাদ এখানে ভোট চাইতে পারেন। তবুতো ওঁর রেলই কিছুটা হলেও দানাপানি যোগাচ্ছে। শিবরাজ ভোট চান কোন্ মুখে!
কাঞ্চা বাঈ, ধ্যান সিংরা তবু শিবরাজ সিং চৌহানকেই ভোট দেন। এবারও দেবেন। মানে, দিতে হয়। আবার ভোট দিতে না গেলেও তো উঠে যেতে হবে এই গ্রাম ছেড়ে। ভোটের দিন সাতেক আগেই ভীম কোঠিতে পৌঁছে গেছে সেই শাসানি।
রাজধানী ভোপাল লাগোয়া বুধনি— মুখ্যমন্ত্রীর বিধানসভা ক্ষেত্র। নাগপুরের পথে কিলোমিটার পঞ্চাশেক এগোলেই ছুঁয়ে দেখা যাবে মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন কারনামা। ভীমবেটকা ট্যুরিস্ট কটেজেই গাড়ি রেখে মোটরবাইকে সওয়ার হতে হয়েছে। কারণ জঙ্গলের রাস্তায় গাড়ি নাকি পৌঁছাবে না। সাহাগঞ্জের রাস্তা যেখানে ভাগ হয়েছে তার থেকে খানিকটা এগিয়েই রাকেশের বাইক জঙ্গলের পথ ধরলো। পথ বলা ভুল হবে। বোল্ডার টপকে দ্বিচক্রযানের এগিয়ে চলা। এভাবেই কিলোমিটার দশেক ভাঙতেই হঠাৎ একটা ফাঁকা চত্বর। গ্রাম বলা যাবে কিনা জানিনা, তবে এই ভীম কোঠিতে এখন ছেলেবুড়ো মিলে ১০৭জনের বাস। ঘর পনেরোটা, তাতেই আঠাশটা ভিলালা পরিবারের আষ্টেপিষ্টে মাথা গোঁজা।
শীঘ্রই এ মহল্লার জনসংখ্যা বাড়বে, পেট বাড়বে আরো একটা।
গ্রামের রেহেন্দা বাঈ যে সন্তানসম্ভবা।
ঘরে ফরে উঁকি দিয়ে ওদের গেরস্থালি দেখার চেষ্টা। সেই সংসারে হাজারো তালি, শতেক ছিদ্র, বাড়াবাড়ি রকমের অনটন। ঘরের আড়াআড়ি পাঁচিল তুলে মানুষ আর পশুর সহাবস্থান। গুলাব সিং ভিলালার কথায়, বখরি আন্দার, গাই বাহার। সব ঘরের সামনেই একটা মাচান করে তার নিচে রাতভর বাঁধা থাকে ওদের গাই-বাছুরগুলো। আর ঘরে ওদের সঙ্গেই রাত কাটায় পোষা ছাগলগুলো।
মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্রের এই গ্রামে না আছে কোনো স্কুল, না আছে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। পানীয় জলের জন্য ভরসা দু’কিলোমিটার দূরের নালা, রেললাইন টপকে যেতে হয়। বর্ষায় সে জল পেটে পড়তেই অসুখ-বিসুখ। তবে বি পি এল কার্ড আছে। রেশন দোকান, তাও দশ কিলোমিটার দূরে। দশ টাকা কেজি দরে চাল মেলে, গম ৮টাকা আর মিট্টি কা তেল কিনতে হয় ১২টাকা দিয়ে। এত দাম কেন?— রেশনওয়ালা বলে, ট্রাক্টরে করে মাল আনতে কত খরচ জানো?
এ গ্রামও ফসল ফলায়। তবে বৃষ্টি হলে। বছরে একবার। জঙ্গল সরানো জমিতে মক্কা হয়। ছয় বাচ্চার মা, সুনীতা বাঈয়ের বড়ই আক্ষেপ, গ্রামে একটাও বলদ নেই। তাহলে আর স্বামী-স্ত্রী মিলে লাঙল চষতে অত কষ্ট হয় না।
জমির পাট্টা চেয়ে এগ্রামের ৩৫জন আবেদন করেছেন। আর সেকথা মনে করাতেই দশ কিলোমিটার পথ ঠেঙিয়ে যেতে হয় খান্ডোয়ার গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে। এ আর নগরের সেই গ্রামেই থাকেন রীতিমতো ভোটে যেতা মহিলা পঞ্চায়েত-প্রধান। ভীম কোঠির কেউই তাঁর নাম জানে না। সকলে চেনে আপ সিংকে, সেই মহিলার স্বামী। পাশে দাঁড়িয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একতা পরিষদের রাকেশ সিং ফুটনোট দিলেন— ‘এস পি—সরপঞ্চ পতি’।
তা বলে মুখ্যমন্ত্রীর এই গ্রাম পূর্ণ-নিরক্ষর নয়। এ গ্রামের রমেশ সিং ভিলালা নাম সই করতে পারেন। প্রতিদিন দশ কিলোমিটার দূরের এ আর নগরের স্কুলে গিয়ে ক্লাস থ্রি’র বিদ্যে আছে তার পেটে। তাই চার বাচ্চার পর স্ত্রীর অপারেশনটা করিয়ে নিয়েছেন। এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তদ্বিরে একজন শিক্ষক এগ্রামের জন্য নিয়োগ হয়েছেন। কিন্তু দশ-দশ-কুড়ি কিলোমিটার পথ হেঁটে রোজ আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। আসেন মাসে একদিন।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা? কারো রোগ বালাই হলে। জঙ্গলের জড়িবুটিতেই কাম চালাই। না পারলে, সেই আপনারা যেকান থেকে জঙ্গলে ঢুকলেন, সেই দশ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে লরিতে চেপে হাসপাতাল। বছর পাঁচেক আগে এ আর নগরে নিয়ে গিয়ে একবার পোলিওর টীকাকরণ হয়েছিল। তারপর আর নয়। হায়! ‘হু’র পোলিও নির্মূল করার স্বপ্ন।
বিকাশ সংবাদের রাজু খোঁজ দিচ্ছিলেন, ঐ গ্রামের ৯০% বাচ্চা গ্রেড থ্রি স্টেজের ম্যালনিউট্রিশনে ভুগছে।
সেই সাক্ষর রমেশকেই প্রশ্ন— এতদূরে এই জঙ্গলে পড়ে আছেন কেন।
— আরে এই জঙ্গলই তো আমাদের পান্তা-পানির জোগানদার। গরমে কত ফল মহুয়া, গোন্ড, চিরঞ্জীবী। জঙ্গল দিয়েই ঘরবাড়ি, আবার জঙ্গল দিয়েই ব্যাধির ওষুধ। তাছাড়া আমাদের গরু, ছাগলগুলি। এগুলিই তো আমাদের সম্পদ। নিজেদের খুশি মতো ঘাস, পাতা খেয়েই এগুলো পুষ্ট হয়ে ওঠে। অন্য জায়গায় গেলে এসব কিছুর জন্য পয়সা লাগবে। অন্য জায়গায় গেলে গরু, ছাগল, মুরগিগুলোই বা থাকবে কোথায়, খাবে কী? অভাবের দিনে একটা ছাগল বেচলে তো কিছু পয়সা হয়।
তাছাড়া কী করবো অন্য জায়গায় গেলে? এখানে তো তবু রেলের কাজ মেলে। লাইনের পাথর সরানো, পাটরি বদলানো। ন’টা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত কাজ। সপ্তাহে ছ’দিন কাজ। নব্বই টাকা রোজ। সবসময় অবশ্য কাজ হয় না। আবার ধরুন, জঙ্গলে যখন গাছ কাটার নিলাম হয়, ঠিকাদারের কাছে কাজ মেলে। অন্য জায়গায় গেলে তো আর এসব পাবনা।
পাশে বসা বয়স্ক নানা সিং জুড়লেন, ২৫ বছর ধরে এখানে রয়েছি। খরগোন জেলার সেন্ধোয়া থেকে উৎখাত হয়ে এখানে এসেছিলাম। আর কোথাও উৎখাত হতে চাই না।
নব্বইয়ে নাগাদ নাকেদার (বন আধিকারিক) পরেশান করছিল, ভাগিয়ে দিতে চাইছিল, তখন খোঁজখবর করে গিয়েছিলাম শিবরাজ সিংয়ের কাছে। তখনও তিনি এখানকার বিধায়ক। বন দপ্তরকে চিঠি দিয়ে আরজি জানিয়েছিলেন, এঁদের যেন তোলা না হয়। সেই চিঠির একটা কপি বহু যত্নে সুরক্ষিত রমেশের ফাইলে।
তারপর সেই এখান থেকেই সাংসদ, পাঁচ বার বিধানসভায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এখন তো মুখ্যমন্ত্রী। বিজলী তো দূর-অস্ত, এই পঁচিশ বছরে ভীম কোঠিতে পৌঁছায়নি স্কুল, পৌঁছায়নি অঙ্গনওয়াড়ি, পৌঁছায়নি রেশন দোকান।
কিন্তু সেই একটা চিঠির জোরে শিবরাজ গোটা ত্রিশেক ভোট কিনে রেখেছেন। সাতাশ তারিখ তাঁরা কুড়ি কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ভোট দিতে যাবেন রতনপুর সেমরিতে।
পরদিন থেকেই আবার সভেরে চার বাজে উঠনা, কাম ঢুন্ডনা...
পুনশ্চ: আরেকটু হলেই হয়েছিল আর কী! জঙ্গলের চড়াই ভাঙতে গিয়ে রাকেশের হিরো হুণ্ডা মাঝে মধ্যেই গোঙাচ্ছিল। একটা বড় চড়াই দেখে পেছন থেকে আমি নেমে পড়লাম, যাতে ওর একটু সুবিধা হয়। নামতেই ও তরতর করে উঠে গেলো। পেছনের বাইকে আরেক সাংবাদিক বন্ধু বললেন, ‘ও বুঝতেই পারেনি। আপনি নেমে গেছেন। উঠে পড়ুন, আমার বাইকে।’ দশ মিনিট এমনভাবে যাওয়ার পর যখন বিকাশের পাশে পাশে চলতে থাকলাম, শুনি, আমি পেছনে রয়েছি মনে করে ও রানিং কমেন্ট্রি চালিয়ে যাচ্ছে- কবে এ রাস্তায় প্রথম এসেছিল, এ জঙ্গলে কী কী (শ্বাপদ) আছে... এমন অনেক কিছু। আমাকে সুনীলের বাইকে দেখে তো ওঁর চক্ষু চড়ক গাছ।
এটা ঘটেছিল ভীম কোঠি থেকে ফেরার পথে। রাস্তা থেকে তা কিলোমিটার ছয়েক জঙ্গলের ভেতরে। আশা করি আর কিছু বলার দরকার নেই।